Thursday, 2 April 2020

দীপঙ্কর মুখার্জী-এর একটি কবিতা:(অক্ষমালী)






               ভয়

 

জানি না ব্রাহ্মণ্যরাজ কতটা নিষ্ঠুর ছিল,
কেমন ছিল অস্পৃশ্যতার সে সুতীক্ষ্ণ দংশন।

ফ্যালফ্যালে চোখে কিশোরীর দেবী দর্শনের নিষেধাজ্ঞার কালো রঙ
কতটা ঘনীভূত হতো শ্রাবণধারায়, তাও জানি না।

জানি না সন্তান বুকে তুলে সুধা দেওয়া কোনো মায়ের বুক
এভাবে আর কখনো সংশয়ে দুলতো কি না।

এমন চৈতি রাতে প্রিয়ার সুগন্ধী চুলে সামান্য স্পর্শেও
ভয়ে হিম হতো কি না কোনো বেনীমাধবের আঙুল, তাও জানি না।

শুধু জানি ক্ষণস্থায়ী কোনো মাহেন্দ্রক্ষণে এ ভয়ের
কলস সকলকে নিমেষে শুধুই মানুষ করেছে।
 
এ ভয় অনেকের ঘরের রন্ধ্রে খড় জুগিয়েছে,
ঘুম ভাঙতেই হারিয়ে যাওয়া সংসার থালায় বেড়ে তাদের হাতে তুলে দিয়েছে বহুযুগ পর চেটেপুটে দেখার জন্য।

এ ভয় ফিরিয়ে দিয়েছে সন্ত্রস্ত পক্ষীকূলকে তাদের বড়ো আপনার নিখিল এ ভূবন,
এ ভয় নগর জীবনকে দিয়েছে গাঢ় অপরাজিতা রঙের এক অবারিত আকাশ,
অনন্ত বৃক্ষকূলকে দিয়েছে নির্মেদ শ্বাসবায়ু প্রস্তুতের অফুরন্ত আয়োজন।

করোনাকে দেশত্যাগী করে এ ভয়কে আমি পান করতে চাই আকন্ঠ।

Wednesday, 1 April 2020




সুজিত পাঠক-এর একটি কবিতা:



নির্লজ্জ

       
চেয়ে আছেন মহারাজ,
উদাস দৃষ্টিতে।
বীরত্বের জয়গান যার বধে
ঈশ্বরের সৃষ্টিতে।
সেই তৃষ্ণার্ত মহারাজ,
একটু জলের আশায়
পড়েছিলেন গাড্ডায় আজ।
বড্ড অসহায়।
উদ্ধত অহংকার,
যার শিরায় শিরায়,
অভিধানে নেই যার পরাজয়।
ঈশ্বরপ্রেরিত সুন্দর,
ডোরাকাটা পিঙ্গলদেহে,
পেশীবহুল রাজন্য পরিধানে,
বাধাহীন অরণ্যে।
শিকার বিনা যিনি
করেননি আহার অকারণে,
রাজকীয় বৈভব, তার
বনেদি আচরণে।
গাড্ডায় নিমজ্জিত
ঠায় ।
চেয়েছিলেন ঈশ্বরে
রাজ ব্যবহার পশুদের সমাজে।
পশুরা করেছিল অমর্যাদার
নির্লজ্জ নির্মম প্রকাশ।
এই দুর্দিনে তার আজ।
ভুলে গিয়েছিল ওরা,
তার শিকারের উচ্ছিষ্ট ভাগ
পরে থাকা ভাগাড়ে আসে।
বেঁচে থাকার রসদ
 গবাদির লাশে।
জোটবদ্ধ কপিরা নাচে উল্লাসে।
                     

সুজন ডাকুয়ার কবিতা:







                       লক-ডাউন

                   
                             (১)
আজ বসন্ত কোথায় তবে ফাগুন দিনের রঙিন স্পর্শ
লক-ডাউনের চিত্র এখন থমকে আছে ভারতবর্ষ,
জীবন সুধা নিঙড়ে পড়ে খোলা বোতল আলগা ছিপি
বদ্ধ ঘরে কাব্য লিখি, মৃত্যুদিনের পান্ডুলিপি ৷
                              (২)
তোমরা কেমন ঘরবন্দী সব আমরা তবু হাঁটছি পথে
তোমরা খাবার মজুত করো আমরা বাঁচি কোনোমতে,
বড্ড এখন সন্দেহ হয় দু'দিন পরে বাঁচবো কিনা
আজকে থেকেই উপোস শুরু ইয়ে জিন্দেগী জিন্দেগী না ৷
                              (৩)
বিশ্ব জুড়ে আকাল এখন, নতুন সকাল গুনছে প্রহর
আমার গ্রামে জীবন বাঁচুক বাঁচুক তোমার প্রাণের শহর
মানবসমাজ যতই নিকট হচ্ছে দেখো মৃত্যু খাদের
ততই আওয়াজ হয় জোরালো সাম্যবাদের সাম্যবাদের ৷

খোকন বর্মন-এর একটি কবিতা:



অনিশ্চিত মৌসুমী


লকডাউনের দিনে বড়ো বড়ো স্বপ্ন দেখতে হয় না,
বহুদিন প্রিয় ঠোঁটটির সঙ্গে সম্পর্ক নেই।
এই শীতঘুমের পরে প্রেমিকাও খোসা ছাড়তে পারে ইউক্যালিপটাসের মতো।
গিরগিটির তুলনায় মৌসুমী বায়ুকে বেশি ভয় পাই,
ভয় পাই তোমার জীবনে আসা অনিশ্চিত ফাল্গুনকে।

আমরা কি কখনো প্রেমিক হতে পারব না?
পারব না আমরা কখনো প্রেমিক হতে!


হঠাৎ করেই সম্পর্কের মাঝে কালবৈশাখী বয়ে গেলে হবে না তোমার আমার প্রেমের পহেলা বৈশাখ।
              

রিনা রানী দাস-এর একটি কবিতা:

ঘুষ


ল্যাম্প‌পো‌স্টের নিয়‌নে দুই মাতা‌লের তর্কাত‌র্কি
সাদা জামার মাতাল, অন্যজন কা‌লো পাঞ্জাবী
জামা, পাঞ্জাবী দু‌'‌টোই বিনয় কাকার খ‌ুব সখ
কখনও ম‌নের দা‌মে কো‌নো‌দিন প‌ড়েনি বেভু‌লে

‌পেনশ‌ন ফাইল জমা...জামার প‌কে‌টে বহু‌দিন
আর, ছে‌লের চাকরী...পাঞ্জাবীর হাতা‌লেই ঝু‌লে
মাতা‌লের মাতলা‌মি বে‌ড়ে গে‌ছে রা‌ষ্ট্রের মোড়‌কে
‌জামা, প‌াঞ্জাবীর খো‌পে উদাস বৃ‌দ্ধের লক্ষ্মীপু‌জো

পাঞ্জাবী চায় অগ্রীম। ব‌ন্দি ফাইল ছা‌ড়ে না জামা 
উপায় না পে‌য়ে ছোঁ‌টে প্রান্ত বেলার বৃদ্ধ না‌বিক
জামা‌কে বন্ধক রা‌খে পাঞ্জাবীর শুভ্র সাদা থা‌নে
পু‌রোটা জীবন ‌বেঁ‌চে সোনার হ‌রিণ নি‌লো কি‌নে

কা‌লো আর সাদা যো‌গে ধূসর র‌ঙের খেলা জ‌মে
‌কে এঁ‌কে‌ছে মৃত্যু ভা‌লো...দু'মাতা‌ল ক‌রে তর্কাত‌র্ক

স্বপ্ননীল রুদ্র-এর একটি কবিতা:





সিলেবাস

সিসৃক্ষু ছাত্রের মতো আমি তোমাকে মুখস্থ করি,
পাতা উল্টে উল্টে দেখি অনুচ্ছেদের কেয়ারি করা
ছোট চৌকো ফুল-ক্ষেত, সরু সবুজ লতার জরি
নাকের নথের মতো ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র লাল ফুলে ভরা

অনুচ্ছেদের তলায় জমিটি বাঁকা, সবুজ ঢাল;
নিবিষ্ট কিছু পিঁপড়ে আর রঙিন পোকামাকড়
রুটমার্চ করে দূরে, শুকনো পাতার আড়ালে কাল
একলা বিকেল বেলায় চলে গেছে খুঁজে নিয়ে দোর

দ্বিধান্বিত ছাত্রের মতন মন দিই পুনঃপাঠে ;
ভাবি একই সিলেবাস থাকে যেন আগামী বছর---
মুখস্থ যাচাই করি, স্মরণযোগ্য স্মৃতিরা হাঁটে
পরীক্ষার দিকে হেঁটে যায় ফলের স্বপ্নে বিভোর

পঠিত বিষয় লিখি, না দেখে নিজেকে রাখছি টুকে
তোমার অক্ষর দিয়ে অন্ধের মতন লাঠি ঠুকে...


কবি সুজিত অধিকারী-এর একটি কবিতা:







তাহাদের চোখ


উত্তরে ক্যামেরা দক্ষিনে চোখ
ডুবে থাকি ডুয়ার্সের বনে
কষ্ট হয় সাতটা হাতি মারা গেল

দক্ষিনে পড়ে আছে তাহাদের চোখ

নীলাঞ্জনা,শুধু দক্ষিনের চোখগুলি সরিয়ে নাও

(কবির "দীর্ঘ ভাঙনের পর আমি আর নদী''কাব্যগ্রন্থ থেকে একটি কবিতা।কৃতজ্ঞতা কবি অজিত অধিকারী।)

সম্পাদকীয়: